এশিয়ান গেমসের মঞ্চে একচ্ছত্র আধিপত্য দেখিয়ে ১৬৯টি স্বর্ণপদক নিয়ে চীন যখন শ্রেষ্ঠত্বের উদযাপনে ব্যস্ত, তখন মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক—ওরা বোধহয় এই গ্রহের অ্যাথলেট নন! একটু দূরে দাঁড়িয়ে সেই উৎসব দেখছিল স্বাগতিক জাপান। দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেও তাদের চোখেমুখে ছিল সন্তুষ্টির ছাপ। আর একটু তাকালেই চোখে পড়ত এক নতুন ভারতের উত্থান—দক্ষিণ এশিয়ার সেরা হয়ে যারা টপ টেনের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে।
একটি মাত্র ব্রোঞ্জপদক নিয়ে পদক তালিকায় ৩৭তম স্থানে থেকে অ্যাথলেটরা যখন দেশের বিমান ধরছেন, তখন আরও একবার স্পষ্ট হয়ে গেল—পরিকল্পনাহীনতার চাদর মুড়ি দিয়ে বড় মঞ্চে শুধু হতাশার গল্পই লেখা যায়। অন্যরা যখন পদকের খনি খুঁড়ছে, বাংলাদেশ তখন কেবল শূন্যতা আর আক্ষেপের হিসাব মেলাচ্ছে। এখন অপেক্ষা চার বছর পর দোহা এশিয়ান গেমসের।
আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমসে ঐতিহ্য বজায় রেখেই পুল ও ট্র্যাকে নিজেদের আধিপত্য ধরে রেখেছে শক্তিশালী চীন। তবে গত আসরের হাংঝু এশিয়ান গেমসের মতো এবার ঘরের মাঠের সেই অবিশ্বাস্য সাফল্য তারা দেখাতে পারেনি। ২০২৩ সালে চীন রেকর্ড ২০১টি স্বর্ণসহ মোট ৩৮৩টি পদক জিতেছিল।
তবুও দেশের বাইরে অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমসের ইতিহাসে এবার নিজেদের সেরা সাফল্য পেয়েছে চীন। ১৬৯টি স্বর্ণসহ মোট ৩৪১টি পদক নিয়ে তারা ছাড়িয়ে গেছে ২০০৬ সালের দোহা এশিয়ান গেমসে গড়া ১৬৫ স্বর্ণপদকের রেকর্ড।
সাঁতারে চীন একাই জিতেছে রেকর্ড ৩০টি স্বর্ণপদক। মাত্র ১৩ বছর বয়সী উদীয়মান সাঁতারু ইউ জিদি মেয়েদের ২০০ মিটার ইন্ডিভিজুয়াল মিডলেতে এশিয়ান রেকর্ড গড়েছেন। পাশাপাশি ২০০ মিটার বাটারফ্লাই ও ৪০০ মিটার ইন্ডিভিজুয়াল মিডলেতে গেমস রেকর্ড গড়ে তিনি নির্বাচিত হয়েছেন গেমসের সেরা নারী ক্রীড়াবিদ।
শুটিংয়েও দাপট দেখিয়েছে চীন। স্কিট মিক্সড টিম ইভেন্টে লিউ জিয়ানলিন ও জিয়াং ইটিং ৫২ স্কোর করে নতুন বিশ্ব রেকর্ড গড়েছেন।
অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রত্যাশার পারদটা চড়েছিল চেনা ইভেন্টগুলো ঘিরেই—ক্রিকেট, কাবাডি, আর্চারি কিংবা শুটিং। আশা ছিল, এসব মঞ্চ থেকেই অন্তত লড়াইয়ের কিছু রসদ মিলবে। কিন্তু মাঠের লড়াই শুরু হতেই দেখা গেল দলগত কিংবা ব্যক্তিগত—প্রায় প্রতিটি ইভেন্টেই বাংলাদেশকে হতাশ করেছে পারফরম্যান্স।
বরাবরের মতোই অ্যাথলেটদের একমাত্র সান্ত্বনা হয়ে রইল গায়ে জড়ানো লাল-সবুজ পতাকাসংবলিত সেই ব্লেজার। আন্তর্জাতিক সফরের স্মারক হিসেবে যা শেষ পর্যন্ত ফিরে যাবে ট্রাঙ্কবন্দি হয়ে। তবে এবারের ব্যর্থতা সহজে পার পাওয়ার সুযোগ নেই।
ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক জানিয়েছেন, এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের ব্যর্থতার কারণ খুঁজে বের করতে এরই মধ্যে একটি বিশেষ মূল্যায়ন কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিনি বলেন, এবারের পারফরম্যান্স অত্যন্ত হতাশাজনক ছিল। ব্যর্থতার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণ করবে এই কমিটি।
সরকারের লক্ষ্য শুধু আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা নয়, বরং সরাসরি পদকের জন্য লড়াই করা—এমন বার্তাও দিয়েছেন তিনি। অর্থাৎ বড় মঞ্চে শুধু অংশগ্রহণের জন্য অংশগ্রহণ নয়, এবার প্রয়োজন পদক জয়ের বাস্তব প্রস্তুতি।
প্রতিবেশী ভারত এবার জিতেছে মোট ৮৫টি পদক—২১টি স্বর্ণ, ২৭টি রৌপ্য ও ৩৭টি ব্রোঞ্জ। ক্রিকেটে নারী দল, কাবাডিতে পুরুষ ও নারী দল, আর্চারি এবং হকির মতো গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্টে স্বর্ণ জিতে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরেছে তারা।
শ্রীলঙ্কা পুরুষদের জ্যাভলিন থ্রোতে স্বর্ণের পাশাপাশি নারী ক্রিকেটে রৌপ্যপদক জিতেছে। পাকিস্তান পুরুষ ক্রিকেটে ভারতের কাছে হেরে রৌপ্য জেতার পাশাপাশি মোট ১০টি পদক নিয়ে আসর শেষ করেছে। নেপাল পেয়েছে দুটি ব্রোঞ্জ।
এই তুলনাতেই আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে বাংলাদেশের হতাশাজনক অবস্থান। বাংলাদেশের হয়ে একমাত্র পদকটি এসেছে নারী উশু অ্যাথলেট জিন্নাত আক্তারের হাত ধরে।