মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা এবং যুক্তরাষ্ট্রের উপকূলে ঘূর্ণিঝড়ের কারণে তেল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে প্রায় ৫ শতাংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে শেয়ার ও বন্ডবাজারেও বড় ধরনের বিক্রির চাপ তৈরি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৫ দশমিক ৩০ ডলারে উঠেছে। তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মূল্যস্ফীতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বাজারে অস্থিরতার অন্যতম কারণ মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও বাড়ার আশঙ্কা। দ্য আটলান্টিকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনা তৈরির জন্য পেন্টাগনকে নির্দেশ দিয়েছে হোয়াইট হাউস। তবে সম্ভাব্য হামলার ধরন, লক্ষ্যবস্তু কিংবা আদৌ কোনো অভিযান হবে কি না—এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান হলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বৈশ্বিক তেল সরবরাহে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তেহরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সংঘাতের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার ঘটনা বেড়েছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে জাহাজ চলাচল কমে তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
বুধবার কাতারের উত্তর উপকূলের কাছে একটি তেলবাহী ট্যাংকারে প্রজেক্টাইল হামলার ঘটনাও ঘটে। যুক্তরাজ্যের Maritime Trade Operations জানিয়েছে, ওই ঘটনায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।
এর পাশাপাশি মেক্সিকো উপসাগরে তেল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও তেলের দাম বাড়িয়েছে। আটলান্টিক মৌসুমের প্রথম হারিকেনে পরিণত হয়েছে ক্রান্তীয় ঝড় ইসাইয়াস। ঝড়টি তেল উৎপাদন অঞ্চলের দিকে এগিয়ে আসায় শেল ও শেভরন উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ করার কথা জানিয়েছে। শুক্রবার বা শনিবার ঝড়টি স্থলভাগে আঘাত হানতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব ইতোমধ্যে পরিবহন খাতেও পড়তে শুরু করেছে। ডেনমার্কভিত্তিক শিপিং কোম্পানি মার্স্ক জানিয়েছে, রপ্তানি পণ্য সংগ্রহ ও আমদানি পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে জ্বালানি সারচার্জ বাড়ানো হচ্ছে।
তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি নিয়েও উদ্বেগ বেড়েছে। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে সুদের হার বাড়াতে হতে পারে।
বৃহস্পতিবার সরকারি বন্ডের বাজারেও বড় ধরনের বিক্রি দেখা গেছে। যুক্তরাজ্যের ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদহার ৬ বেসিস পয়েন্ট বেড়ে ৫ দশমিক ৫১৫ শতাংশে উঠেছে, যা ২০০৭ সালের জুলাইয়ের পর সর্বোচ্চ। ৩০ বছর মেয়াদি বন্ডের সুদহারও বেড়ে ৬ দশমিক ০১১৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
ফ্রান্সের ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদহার ৬ বেসিস পয়েন্ট বেড়ে ৪ দশমিক ৯৩১ শতাংশ এবং জার্মানির ১০ বছর মেয়াদি বন্ডের সুদহার ২ বেসিস পয়েন্ট বেড়ে ৩ দশমিক ৫০৪ শতাংশ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদহারও ৫ বেসিস পয়েন্ট বেড়ে ৫ দশমিক ৩৩১ শতাংশে উঠেছে।
বিশ্বের শেয়ারবাজারেও এর নেতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে। জাপানের নিক্কেই সূচক ১ দশমিক ৪ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কোস্পি সূচক ২ দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে। ইউরোপের বড় কোম্পানিগুলোর শেয়ার নিয়ে গঠিত স্টক্স ইউরোপ ৬০০ সূচক কমেছে শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ। দিনের শুরুতে যুক্তরাজ্যের এফটিএসই ১০০ সূচকও শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ কমে যায়।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, তেল সরবরাহের সম্ভাব্য বিঘ্ন এবং জ্বালানি ব্যয়ের চাপ—এই তিনটি বিষয়ই বর্তমানে বৈশ্বিক বাজারে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলছে।